আদা চাষ পদ্ধতি – ইদানিংকার সময়ে অনেকের মুখেই আদা চাষ করার কথা শুনা যায় ৷ পত্রপত্রিকার কৃষি পাতায় আদা চাষীদের সফলতা নিয়ে লেখালেখি ও হচ্ছে বৈকি! এর মূখ্য কারন হলো, আদা চাষ অত্যন্ত লাভজনক ৷ কম খরচে, কম পরিশ্রমে, বেশি উপার্জন করার এই সুযোগ তাই সুযোগসন্ধানী ও বুদ্ধিমান মানুষ মাত্রই লুফে নিচ্ছেন ৷
কেবলমাত্র প্রান্তিক চাষীদের মতো ক্ষেতে চাষাবাদ করে নয়, বরং এই আদা চাষের জন্য রয়েছে নানাবিধ পদ্ধতি ৷ যা গ্রাম্য-শহুরে সকলের জন্যই আদা চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হবার সুযোগ এনে দিয়েছে ৷
আদা চাষ কিভাবে করা যায় ?
নানাবিধ পন্থায় আদা চাষ করা যায় ৷ বানিজ্যিকভাবে সফলতা পাওয়া যাচ্ছে বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি অনুসরণে ৷ এছাড়াও সফলতা রয়েছে ছাদে আদা চাষে ও টবে আদা চাষে ৷
আদা চাষে সফলতা :
রংপুরের হত দরিদ্র আবেদ আলী আদা চাষ করে আজ টিনের বাড়ি, ৭৫ শতক জমির মালিক হয়ে গিয়েছেন ৷ ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছেন দুই মেয়ের ৷
তেমনি আদা চাষ করে সফলতা পেয়েছেন বুড়িরহাট গ্রামের আদাচাষি ফত্তাজুল ইসলাম, রহিমাপুর গ্রামের ফয়সাল হোসেন, নওগাঁর মোনায়েম হোসেন সহ আরও অনেকেই ৷ একর প্রতি আদা চাষ করে লাভ হয় দেড় থেকে আড়াই লক্ষ টাকা ৷
এমন লোকের সংখ্যা সীমিত যারা আদা চাষ করে সফলতা পাননি ৷ খোজ করলে দেখা যাবে সঠিকভাবে আদা চাষ করা সকলেই সফলতা পেয়েছেন ৷
আদা চাষ পদ্ধতি :
আদা চাষ করে লাভবান হওযার জন্য এর চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা প্রয়োজন রয়েছে ৷ আদা চাষের একাধিক পদ্ধতি থাকায় নিজের সামর্থ্য, সক্ষমতার সাথে মিলিয়ে আদা চাষ করার পদ্ধতি বেছে নিয়ে চাষাবাদ করার মাধ্যমে সবচেয়ে ভালো ফলাফল লাভ করা যাবে ৷ নিচে আমরা আদা চাষ করার পদ্ধতি গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি –
জমিতে আদা চাষ পদ্ধতি :
জমিতে আদা চাষ সবচেয়ে বেশি প্রচলিত৷ জমিতে আদা চাষ করার জন্য উপযুক্ত মাটি হিসেবে বলা হয় বেলে দো-আঁশ বা দো-আশঁ মাটির চাষযোগ্য জমির মাটিকে ৷ জমির পানি ভালোমত নিষ্কেশিত হবে এরূপ জমিতে বাংলা ফাল্গুন থেকে বৈশাখ মাসের ভেতরে আদার বীজ বপন করার জন্য সময় নির্ধারণ করে নিতে হবে ৷
আদার বীজ বপনের জন্য জমিতে কিন্তু আগেই কন্দ করে নিতে হবে ৷ কন্দ করা হয়ে গেলে তারমধ্যে বীজ বপন করে দিতে হবে ৷ কন্দ তৈরি করার সময় প্রতিটি কন্দ ১২ থেকে ১৫ গ্রাম ওজনের হবে ও কন্দ প্রতি কুড়ির সংখ্যা হবে একটি বা দুটি করে ৷ প্রতিটি আদার দূরত্ব হতে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ সেমি দূরবর্তী ৷
>> এলাচ চাষ পদ্ধতি ও এর উপকারিতা সহ বিস্তারিত জেনে নিন।
যখন কন্দ প্রস্তুত হবে ও লাগানো হয়ে যাবে তারপর ভেলী করে ফেলতে হবে ৷ প্রতি হেক্টরের জন্য হাজার এক এর মতো আদার বীজের চারা রোপন করা সঠিক সিদ্ধান্ত হবে ৷
বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি :
বস্তায় আদা চাষ করার পদ্ধতিকে আদা চাষের আধুনিক পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে ৷ বস্তায় আদা চাষ করার জন্য প্রয়োজন হয় বিভিন্ন ধরণের বস্তার ও তাতে দিতে হয় মাটি ৷ বস্তা হিসেবে সিমেন্টের বা আলুর বস্তা ভালো হবে ৷ বস্তায় ছাকনি দিয়ে মাটি ছেকে দিতে হবে ৷ মাটির সঙ্গে মিশাতে হবে জৈব সার বা গোবর ৩:১ অনুপাতে ৷

একসঙ্গে ছাই দিয়ে দেওয়া যেতে পারে ৷ সবগুলো বস্তায় দিয়ে ঝাকিয়ে ঝাকিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে ৷ মিশানো হয়ে গেলে ভিন্ন টবে বালু দিয়ে তাতে বুনে দিন তিনটে টুকরো করা অঙ্কুরিত আদা ৷ অঙ্কুরিত আদা থেকে গাছ বের হবার পর আগে থেকে তৈরি করা বস্তায় তিন স্থানে তা বুনে দিতে হবে ৷
টবে আদা চাষ পদ্ধতি :
টবে আদা চাষ করতে মাটির টব ব্যবহার করার পাশাপাশি বড় তেলের ও পানির বোতলকে টব হিসেবে ব্যবহার করে আদা চাষ করা যায় ৷
আদা থেকে গাছ বের হয়েছে এরকম আদা সর্বোচ্চ তিন টুকরো করে কাটতে হবে ৷ প্রতিটি টুকরায় যেন গাছ থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে ৷
টবে আদা চাষের জন্য মাটির সাথে সমপরিমাণ বা একই হারে গোবর সার ও কিছুটা বালু মিশিয়ে মাটিকে চাষের জন্য উপযুক্ত করতে হবে ৷ এবার তিনটে টুকরো প্রতিটি টবে পুতে দিতে হবে ৷
>> মরিচ চাষ কিভাবে করবেন? মরিচ চাষ পদ্ধতি একনজরে দেখে নিন!
কিছুদিন অপেক্ষা করার পর মাটির নিচ থেকে আদা গাছ বের হবে ৷ এর আগপর্যন্ত প্রতি দুই-তিন দিন অন্তর অন্তর পানি দিতে হবে ও টবকে ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে ৷
টবে আদা চাষ করার জন্য আদা বুনার উপযোগী সময় বছরের শুরু থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৷ সে সময়ে বুনলে আদার ফলন সবচেয়ে ভালো হবে ৷
ছাদে আদা চাষ পদ্ধতি :
যারা শহরে থাকেন তাদের অনেকেই বাসার ছাদে কিভাবে আদা চাষ করা যায় সে সম্পর্কে জানতে চান ৷ আসলে বাসার ছাদে আদা চাষ করার জন্য আলাদা কোন পদ্ধতি নেই ৷ উপরিউক্ত বস্তায় ও টবে আদা চাষ পদ্ধতির যে কোন একটি অনুসরণ করেই বাড়ির ছাদে সুন্দর করে আদা চাষ করা যাবে ৷
আদার রোগ ও তার প্রতিকার :
আদা চাষীরা আদার সবচেয়ে যে কমন রোগটি দেখে থাকেন তা হচ্ছে আদা গাছের পাতা হলুদ হয়ে যাওয়া ৷ আদা গাছের পাতা হলুদ হয়ে যাবার কিছুদিনের ভেতর গাছ শুকিয়ে ঢলে পরে ও আদা নষ্ট হয়ে যায় ৷ এই রোগটিকে “রাইজম জট” নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে ৷ বর্ষাকালে, স্যাতস্যাতে আবহাওয়া এর পেছনে মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে ৷
আদার রোগ প্রতিকার করার জন্য, আদা গাছ রোপনের পনেরো থেকে বিশ দিন পূর্বে মাটি কুপিয়ে নিয়ে তাতে আধা পচা মুরগির বিষ্ঠা প্রয়োগ করে, মাটি উল্টেপাল্টে অতপর ঢেকে দিতে হবে ৷
আদা কোথায় বিক্রি করা যাবে?
আদা চাষের মূল লক্ষ্য আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া হলে আদা বিক্রি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৷ আদার ফলন ভালো হলে ও একসাথে ২০+ কেজি আদা হলে তা পাইকারী বিক্রি করা সবচেয়ে ভালো হবে ৷
আদার ফলন যদি আধা মন বা ২০ কেজির কম হয় তবে খুচরাভাবে বাজারে বিক্রি করা যায় ৷
আদা সংরক্ষণ :
আদা অনেকদিন পর্যন্ত ভালো থাকে ৷ তবে অতিরিক্ত গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়ায় আদা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় ৷ এজন্য আদা সংরক্ষণ করার সময় বাতাস চলাচল করে ও স্বাভাবিক তাপমাত্রা পাওয়া যায় এরকম স্থানে বা ঘরে সংরক্ষণ করাই সবচেয়ে ভালো হয় ৷
ঘরোয়াভাবে দীর্ঘদিন আদা ব্যবহার করতে চাইলে আদা গুড়া করে নেওয়া যায় ৷ কেননা আদা গুড়া পুরো বছর ধরে ব্যবহার করা যাবে ৷ নষ্ট হবেনা ৷
শেষ কথা :
আমাদের দেশের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় আদা চাষ অনেক লাভজনক একটি প্রজেক্ট ৷ আদা চাষ যেহেতু বাড়ির ছাদে বা দুয়ারে/উঠানে, বস্তা পদ্ধতি বা টব পদ্ধতি অনুসরণে করা যায়, তাই যাদের ইচ্ছে বা আগ্রহ হবে তারা অনায়াসেই করতে পারবেন ৷ আদা চাষ পদ্ধতি অনুসরণে কাঙ্খিত ফলাফল লাভ করা কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র ৷