তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম

তাহাজ্জুদ নামাজের সঠিক নিয়ম এবং ফজিলত সহ বিস্তারিত জানুন!

আরবি ভাষা থেকে তাহাজ্জুদ শব্দটির থেকে উৎপত্তি। পবিত্র কোরআনে এর আমল সম্পর্কে বিশদ উল্লেখ আছে। পবিত্র কোরআনের সূরা বনি ইসরাইলের ৭৯ নং প্রিয়নবী কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে যে,’রাতের কিছু অংশ কোরআন পাঠ করুন এবং জাগ্রত থাকুন।’ এমন একটি ফযিলত পূর্ণ তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম সম্পর্কে চলুন আজ জেনে নেয়া যাক।

তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম

তাহাজ্জুদ নামাজ সুন্নত না নফল?

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় রাত্রিকালীন নামাজকে তাহাজ্জুদ নামাজ বলে। সাধারণত এর অর্থ এভাবে বলা যায় যে, কিছুক্ষণ ঘুম যাওয়ার পর ঘুম থেকে উঠে যে নামাজ পড়া হয় তাই তাহাজ্জুদের নামাজ। এই বিষয়ে হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, প্রিয় রাসুলুল্লাহ সা্ল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সব নফল নামাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজ অর্থাৎ রাত্রিকালীন নামাজ।’ (মুসলিম, তিরমিজি, নাসাঈ)। তাহাজ্জুদের নামাজ মূলত নফল নামাজ। এই নামাজকে প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শ্রেষ্ঠ নফল ইবাদত হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার নিয়ম

তাহাজ্জুদ নামাজ ৪ রাকাত, ৮ রাকাত অথবা ১২ রাকাত পড়া যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, “যে ব্যক্তি এশার  নামাজেরে পর দুই বা ততোধিক রাকাত নামাজ পড়ে নেয়, সে তাহাজ্জুদের ফজিলতের অধিকারী হবে।” অতএব তাহাজ্জুদের নামাজ ২ রাকাআত আদায় করলেও তার তাহাজ্জুদ আদায় হয়েছে বলে ধারণ করা হয় । যে কোনো সুরা বা কেরাত দিয়েই এই নামাজ আদায় করা যায়। প্রিয় রাসূল (সাঃ) যথাসম্ভব লম্বা কেরাত এবং লম্বা রুকু ও সেজদা সহকারে একান্ত নিবিষ্ট মনে এই সালাত নামাজ আদায় করতেন। তাই তাহাজ্জুদ নামাজ লম্বা কেরাতে আদায় করা উত্তম। তবে অনেকেই তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম সম্পর্কে না জানার কারণে কিরাতের সময় তাড়াহুড়ো করেন। 

মূলত তাহাজ্জুদ নামাজের কেরাত উঁচু বা নিচু উভয় ভাবে পড়ার নিয়ম রয়েছে। তবে উচু স্বরে তিলাও্যাত করা যদি কারও কষ্টের কারণ হয় তবে নিচু স্বরে পড়া উত্তম। 

তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ত

যিনি এই নামায পড়বেন তিনি সর্ব প্রথম প্রস্তুতি নিয়ে দাড়িয়ে মনে মনে নামাযের নিয়ত করবেন। অথবা মৌখিক নিয়ত করবেন। মৌখিক নিয়ত করলে এর বাংলা উচ্চারণ নিম্নরুপ

  “নাওয়াইতুআন উছায়াল্লিল্লাহি তাআলা রাকাতাই ছলাতিত তাহাজ্জুদী সুন্নাতু রাসুলিল্লাহি তাআলা মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি আল্লাহু আকবার।”

তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের ক্রম

১.  শুরুতে তাকবিরে তাহরিমা ‘আল্লাহু আকবার’ বলে নিয়ত করবেন।

২. এরপর ছানা পড়বেন।

৩.  এরপর  সুরা ফাতেহা পড়ে তার সাথে অন্য একটি সূরা বা কোন সূরার অংশবিশেষ বা কেরাত পড়বেন। চেষ্টা করবেন কেরাত লম্বা করার কেননা প্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাহাজ্জুদের নামাজে অনেক লম্বা কেরাত পড়তেন।

৪. তারপর অন্যান্য নামাজের ন্যায় রুকু এবং সেজদা আদায় করবেন।

এভাবেই প্রথম রাকাতের মত দ্বিতীয় রাকাআত আদায় করে তাশাহহুদ এবং দরূদ ও দোয়াইয়ে মাছুরা পড়ে সালাম ফেরানোর মাধ্যমে এই নামাজ সম্পন্ন করবেন।

ইসলামি শরীয়তে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার আগেও প্রিয় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উপর তাহাজ্জুদের নামাজ বাধ্যতামূলক ছিল। তাই তিনি জীবনে কখনো তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া থেকে বিরত হননি এবং সাহাবায়ে কেরামদেরে এই নামাজ আদায়ের ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন।

তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত

পবিত্র কুরআনুল কারীমে তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য বিশেষভাবে তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারীমে এসেছে “তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করে এবং রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে।” (সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত ১৭-১৮)।

ফরয নামাজের পর অন্যান্য সুন্নাত এবং  নফল নামাযের মধ্যে তাহাজ্জুদ নামাজের গুরুত্ব এবং ফযীলত সবার চেয়ে বেশী। (আহমাদ, মেশকাত ১১০ পৃঃ)। প্রিয় রাসুল (সাঃ) বলেন, আল্লাহ সুবাহানা ওয়া তা’আলা প্রত্যেক রাত্রিতে দুনিয়ার আসমানে  নেমে আসেন যখন রাত্রির এক তৃতীয়াংশ বাকী থাকে । এরপর তিনি সবার উদ্দেশ্যে বলেন, তোমাদের কে আমাকে ডাকবে! আমি তার ডাকেই সাড়া দেব । কে আমার কাছে কিছু চাইবে আমি তাকেই তা দেব, কে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে আমি তার জীবনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেব। (মুসলিম, মেশকাত ১০৯ পৃঃ)

প্রিয় রাসুল (সাঃ) আরো বলেন, যে ব্যক্তি রাত্রে ঘুম থেকে জেগে উঠে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করে এবং সে তার স্ত্রীকেও ঘুম থেকে জাগিয়ে নামায পড়ায় তাগিদ দেয় এমনকি তার স্ত্রী যদি জেগে না উঠে, তবে তার মুখে কিছুটাটা পানি ছিটিয়ে দেয় তাহলে আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালা তার প্রতি রহমত বর্ষণ করে থাকেন। অনুরুপ ভাবে কোন ও মহিলা যদি রাত্রিকালে জাগ্রত হয়ে তাহাজ্জুদ নামায আদায় করে এবং সে তার স্বামীকে নামাযের জন্য জাগিয়ে দেয় এমনকি তার স্বামী না জাগলে স্ত্রী তার স্বামীর মুখে পানি ছিটিয়ে তার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয় তাহলে তার প্রতিও আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালার  রহমত বর্ষিত হতে থাকে। (আবু দাউদ, নাসায়ী, মেশকাত ১০৯ পৃঃ)

তাহাজ্জুদ নামাজের সময়

অনেকেই জানতে চান তাহাজ্জুদের নামাজ কি ইশার নামাজের পর কিংবা ঘুমানোর আগেই পড়া যাবে কি না? মূলত তাহাজ্জুদ শব্দের অর্থ হল ঘুম থেকে জেগে উঠা  অথবা রাত্রি কালে জাগরণ করা ইত্যাদি। তার মানে তাহাজ্জুদ নামাজ হলো, রাতের বেলা ঘুম থেকে উঠে নফল নামাজ আদায় করা। [কুরতুবি, আল জামি’ লি আহকামিল কুরআন: ১০/৩০৭]

হযরত হাজ্জাজ ইবনু আমর আল আনসারি (রা.) হতে বর্ণিত, ‘নিশ্চয়ই তাহাজ্জুদ নামাজ হলো ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করা। (প্রয়োজনে) আবার ঘুমিয়ে আবার জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করা। এমনটিই করতেন প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।’ [ইবনু হাজার, আত তালখিসুল হাবির: ২/৩৫; হাদিসের সনদ হাসান]

ইশারের পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরুর পূর্ব সময় পর্যন্ত রাতের যে কোনো সময়েই ঘুম থেকে ওঠে তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ত করে নফল নামাজ পড়া হলে সেটিকে তাহাজ্জুদে নামাজ হিসেবে গণ্য করা হবে। এমনকি কেউ যদি ইশার নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে ১১/১২-টার দিকে জাগ্রত হয়ে তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ত করে নফল পড়ে, তবে সেটিও তাহাজ্জুদের নামাজ হবে।

তবে, অনেক ফকিহগণ বলেছেন, রাতের বেলা যেকোনো নফল নামাজই তাহাজ্জুদের নামাজ বলে গণ্য হবে। এর জন্য ঘুমানো শর্ত নয়, তবে উত্তম। যেমন: ইমাম হাসান বাসরি (রাহিমাহুল্লাহ্) এমন মত দিয়েছেন। [মাওসু‘আহ ফিকহিয়্যাহ: ২/২৩২; ইবনু কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আযিম]

এককথায় সর্বসম্মত মতে, তাহাজ্জুদ এর নামাজের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট সময়টি হলো রাত্রির শেষভাগ।

কেননা আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালা তার বান্দাদের কে রাত্রির কিছু অংশ কুরআন তিলাওয়াত আর নামায কায়েম করার মধ্য দিয়ে জেগে থাকার জন্য বলেছেন। রাসুল (সাঃ) বলেন, আল্লাহর নিকট অতি প্রিয় নামায দাউদ (আঃ) এর নামায। তিনি অর্ধেক রাত ঘুমাতেন এবং রাতেন তৃতীয় ভাগে নামাযে দাঁড়াতেন আর ৬ষ্ঠ ভাগে আবার ঘুমাতেন। (বুখারী, মুসলিম, মেশকাত ১০৯ পৃঃ)

শেষকথা 

কেয়ামত দিবসের ভয়াবহ ও কঠিন হিসাব-নিকাশের কথা মনে রেখে কোন ব্যক্তি যদি সহজ হিসাব কামনা করে, তবে তার উচিত হবে নিয়মিত তাহাজ্জুদের নামাজ করা। পবিত্র কুরআনুল কারীমের শ্রেষ্ঠতম মুফাসিসর আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (র.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি হাশরের ময়দানে সহজ হিসাব আশা করে, তার উচিত হবে আল্লাহ যেন তাকে প্রত্যহ রাত্রির অন্ধকারে সেজদারত ও দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পান। তার মধ্যে পরকালের চিন্তা ও রহমত প্রাপ্তির আশা ও থাকা দরকার। (তাফসিরে কুরতুবি, মা’আরেফুল কোরআন, ক্বিয়ামুল লাইল)

আল্লাহ সুবাহানাহু তাআলা মুসলিম উম্মাহর সকলকে তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম কানুন যথাযথভাবে জেনে যথাযথভাবে রাতের শেষ ভাগে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন ইয়া রাব। জানাজার নামাজের সঠিক নিয়ম ও দোয়া সহ বিস্তারিত!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top
Scroll to Top